অলিখিত সংসার



অলিখিত সংসার


রুদ্রের বাসাটা চিলেকোঠায়।এ শহরের অনেক বাড়িওয়ালা এইরকম ঘরগুলো ছাত্রদের ভাড়া দেয় অত্যন্ত দয়াপরবশ হয়ে। চারপাশে দেয়াল থাকলেও মাথার উপরে টিন।এমনিতে গরমকাল, তার উপর টিন!ফ্যান চালালে গরম যেনো আরো বাড়ে,মনে হচ্ছে কোনো গরম চুল্লিতে বসে আছি।

রুদ্র দরজা নক করেই ভিতরে ঢুকলো।আমি আসলে সবসময়ই নক করে; ওর এই স্বভাবটা আমার ভীষন ভালো লাগে।ওকে দেখেই হেসে দিলাম।খাটি বৃদ্ধ-বাঙালী পুরুষের মতো পাঞ্জাবি সাথে লুঙ্গি পড়েছে; গলায় একটা লাল গামছা।মাথা নিচু করে হাসছি দেখে বললো,"ভালো করে হেসে নাও। তুমি তো ইনহ্যারিটেন্সে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা পেয়েছো; পরে আবার গ্যাস্ট্রিক বেড়ে যাবে!"

কি বিশ্রী ব্যাপার; লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাওয়ার মতো অবস্থা। মেয়েদের কেউ এভাবে বলে?


রুদ্র আর আমার সম্পর্ক কখন, কিভাবে শুরু হয়েছে তার কোনো হদিস পাই নাহ্ আমার স্মৃতিতে।এমনিতে আমি খুব ভুলোমনা।তবে রুদ্রের স্মৃতিশক্তি প্রখর। আমাদের অমিল অনেক। কিন্তু একটা জায়গায়, আমার আর ওর প্রচন্ড মিল। আমরা দুজনেই এতিম।খুব ভালোভাবে বলতে আমার আর ওর তেমন কোনো শুভাকাঙ্ক্ষী নেই। খুব ছোটবেলায় আমার বাবা মারা যান।মা নামমাত্রে ছিলেন ভাইয়ের সংসারে। একদম বোঝা ছিলাম আমি। আমার মা অবশ্য বেশিদিন ছিলেন নাহ্ নামমাত্রের অবহেলায়।আমার এসএসসির রেজাল্ট দেওয়ার তিনদিন পর, মা অসীমে যাত্রা করেন।তারপরেই বের হয়ে যাই বাসা থেকে। হোস্টেলে উঠি,দুঃসহ এক জীবনের ইতি ঘটাতে চাইলে আরেক অর্থকষ্টের টানাপোড়ন শুরু হয়। ঠিক সেই সময়ের, কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে শেষপ্রান্তে রুদ্রের সাথে আমার দেখা হয়।

রুদ্রের জীবনের দুঃখ আরো গভীর। নাইনে থাকতে মা মারা যান; বাবা আরেক বিয়ে করেন।পড়াশোনা চালানোর দায়ে অন্য মানুষের বাড়িতে লজিং থেকে পড়াতে শুরু করে। দুইবেলা ভাত,আর রাতে ঘুমানোর জায়গা হয়েছিল তখন। কিন্তু বাড়িতে ফেরার পথ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।এক বড় ভাইয়ের আশায় শহরে আসে আমার প্রেমিক; তখন সে অল্প বয়সী ভীতু ভীতু কিশোর!এরপর কোনো মতে পড়ালেখাটা চালিয়ে নিচ্ছে।

দুজনের জীবনের এই বিষন্নতার সময়গুলোতে আমাদের সম্পর্কটাকে যেনো আরো সুন্দর হয়।আমাদের পাশাপাশি থাকাটা যেনো একটা অভ্যাস; আমাদের দুজনের এই জীবনটায় কোনো বিছিন্নতা নেই।

আমরা প্রায়ই একটা সুন্দর সময়ের স্বপ্ন দেখি।আমি আর রুদ্র মিলে টাকা জমাচ্ছি একসাথে। নিজেদের খরচের হিসাবটা প্রতিমাসে এইভাবে একসাথে করার জন্যই রুদ্রের চিলেকোঠার অসহ্য গরম সহ্য করি। তাছাড়া রুদ্রের কাছাকাছি থাকতে আমার ভীষন ভালো লাগে।আমি ভালো রান্না পারি নাহ্; তাও এই একটা দিন রুদ্রের জন্য মনপ্রাণ দিয়ে রাধার চেষ্টা করি।

"মহি?"

"হু?"

"আমাদের ব্যাংকে কতো হলো?"

"এককালীন যা রেখেছিলাম, আরো তিনবছর পর সেইখান থেকে লাভসহ তিনলাখ দিবে।"

"আচ্ছা। তোর ডিপিএসে টাকা রাখিসতো?"

"হ্যা। রাখি তো!"

"আমার সব টাকার নমিনি তোকে করে যাবো,মহি! আমার কিছু হলে তোকে যাতে জীবন নিয়ে ঝামেলায় না পড়তে হয়।"

রুদ্রের কথায় আমার চোখে পানি চলে আসলো।ওর ফুসফুসে কোনো একটা সমস্যা হয়েছে। ডাক্তারা সন্দেহ করছে ক্যান্সার।

রুদ্র প্রথমবার ডাক্তার দেখিয়ে এসে আমাকে বলেছিলো,''মহি, চলতো সিগারেট টিগারেট কিছু খাই। আজীবনতো টাকার জন্য ভালো মতো কিছু খেতেই পারলাম নাহ্!"

এরপর আমি জানপ্রাণ দিয়ে রান্না শেখা শুরু করি; গরুর মাংসের ভুনাটা ভালোই করি এখন।রুদ্র ভালোমন্দ খেতে খুব ভালোবাসে।


রুদ্রের অসুখটা দিনদিন বাড়ছে; শরীর শুকিয়ে যাচ্ছে।ওকে দেখলেই কেমন যেনো একটা অদ্ভুত কষ্ট হয়।আমি যাদের খুব ভালোবেসেছিলাম তারা সবাই খুব তাড়াতাড়িই ছেড়ে যায় আমায়।রুদ্রকে প্রায়ই বলি,একসাথে থাকার কথা; সম্পর্কটাকে একটা সামাজিক স্বীকৃতির কথা।কিন্তু রুদ্রের খুব শখ চারপাশের প্রচুর আলোকসজ্জায় আমাদের সম্পর্কটা 'বিয়ে' নামক একটা সুন্দর রীতির বেড়াজালে হারাবে।

রুদ্র একটা সময় প্রায়ই বলতো,আমরা টাকা জমিয়ে গ্রামে একটা জমি কিনবো; চৌকাঠ ঘর বানাবো!শহরের ছেলেমেয়েরা, ছুটিতে নানবাড়ি-দাদাবাড়ি যায়।আমাদের জন্য যেহেতু কেউই নেই,তাই তাদের জন্য এই ব্যবস্থাটা আমরাই করবো।ছুটিতে ওরা গ্রামে আসবে;আম-জাম কুড়াবে, পুকুরে ঝাপ দিবে। এমন কতো পরিকল্পনা আমরা একসাথে করেছি!


মাঝেমাঝেই ভাবি, আমার আর রুদ্রের সম্পর্কে কোনো পিছুটান আছে? আমরা নিজেরাইতো নিজেদের পিছুটান।


রুদ্র তার জামাকাপড় ইস্ত্রী করছে। চুলায় ভাত চড়িয়ে ওর পেছনে এসে দাড়ালাম।

"মহি?"

"হু?"

"আমার সিন্দুকে একটা লাল শাড়ি আছে,চট করে পড়ে আয় তো!"

"কেনো?"

"বিয়ে করবো!"

"তোর আলোকসজ্জার কি হবে?"

"তাড়াতাড়ি করতো,খেয়েই বের হবো!"


আমি কিংকর্তব্যবিমুড় হয়ে গেলাম।আমার হাত পা কাপছে,লো প্রেসার নাকি কি জানি!আজকের ভাতগুলো হতে এতো দেরি হচ্ছে কেনো??


অলিখিত সংসার

মহিমা!


No comments

ভালোবাসি কি বলতেই হবে?

 ভালোবাসি কি বলতেই হবে? -মহিমা মাঝরাতে রাস্তায় হাঁটবো; কোনো এক নিয়ন-আলোতে ভালোবাসা কুড়াতে... আমাদের দিগন্তটা কোথায় হবে? জোস্নায় শেষ হবে তোহ?...

Theme images by konradlew. Powered by Blogger.