তাহার অপেক্ষায়-ওলিউল্লাহ


গল্পের শুরুটা ২৩ শে মার্চ ২০০৯ তে হয়েছিল। 

সহজ সরল ডানপিটে ছেলে রিমন ক্লাস সেভেন এ পড়ে। ক্লাসের সবার মতোই সে স্বাভাবিক ভাবেই চলাফেরা করে,খেলাধুলা করে কিন্তু তার একটা স্পেশাল কোয়ালিটি আছে। সে পাখির মত ডাকতে পারে।খুব কম কথা বলে।লজ্জা একটু বেশি।

সামনে গ্রীষ্মকালীন ছুটি। স্কুল বন্ধ থাকবে রিমন এর।তাই সে আগে থেকেই প্লান করেছে এবার ছুটিতে সে দাদা বাড়ি যাবে। অনেক দিন হলো সে দাদা বাড়ি যায় না।তার বাবার জন্যই যাওয়া হয়নি।

আজ লাস্ট ক্লাস। ক্লাস শেষে রিমন বাড়ি ফিরছে। মাঝ পথেই সে শুনতে পেলো কিছু মানুষের কানাকানি।সবাই রিমনকে নিয়েই কথা বলতেছে।রিমন বাড়ি ঢুকতেই দেখল বাড়ি ভর্তি মানুষ।রিমন কিছুটা অবাক হলো।কিন্তু কিছু সময় পর রিমন একটু বেশি অবাক হলো কেননা সবাই শুধু রিমন এর দিকেই তাকিয়ে আছে।

কিছু সময় পর রিমন তার মেঝো আপুকে জিজ্ঞেসা করলো, আপু কি হয়েছে? সবাই আমার দিকে এমন করে তাকায় ছিলো কেন?
আপু সব কিছু খুলে বললো রিমনকে।তার বড় আপুকে জ্বীনে আছড় করেছে। সে তাকে ছেড়ে যাবে না। কিন্তু সে যেতে রাজি হয়েছে একটা শর্তে, তাকে রিমনকে দিতে হবে।

ঐদিন রিমন এর বাবা বাড়ি ছিলনা। বাড়ি আসার পর সব শুনে বেচারা চিন্তায় পড়ে গেলেন। কিভাবে সব কিছু সামলে নিবেন।রিমন সব অবস্থা বুঝে আগেই বুঝে ফেললো এবারো তার দাদা বাড়ি যাওয়া হবে না।

সেদিন সকাল ১১ টার দিকে রিমন আম গাছে উঠেছিল আম পাড়ার জন্য। গাছের নিচের দিকে তাকাতেই সে দেখতে পেল একটা মেয়ে বোরকা পড়া সে গাছের নিচ দিয়েই যাচ্ছে এবং সে তার বাড়ির পাশের বাড়িতেই ঢুকলো। সাথে একটা ছেলে, রিমন ভাবলো ছেলেটি হয়তো মেয়েটার রিলেটিভ হবে। 

Drawn by Imran Hossain
Drawn by Imran Hossain
বিকেল বেলা রিমন তার বন্ধু রক্তিম এর সাথে গল্প করছিলো। গল্পচ্ছলে রক্তিম হটাৎ মেয়েটার কথা বলা শুরু করলো। রিমন খুব মনোযোগ দিয়ে রক্তিম এর কথা শুনছিল। এমনিতেই আগে থেকেই রিমন এর মনে কৌতুহুল ছিলো মেয়েটাকে নিয়ে। এবার যখন তার কথাই হচ্ছে তখনতো একটু মনোযোগ বাড়বেই।

যাহোক, সেদিন রিমন জানতে পারলো মেয়েটাও ক্লাস সেভেনে পড়ে। নাম তার রাফা।

পরদিন সকালে রিমন ওই বাড়ির আশপাশ দিয়ে ঘুরতেছে আর মেয়েটাকে খুজছে।কিন্তু দেখা পেলো না তার।তার অপেক্ষা আর শেষ হচ্ছে না। কখন দেখবে সে রাফাকে। তার মন আনচান করছে কখন কথা বলতে পারবে সে রাফার সাথে।

ঐদিন রিমন দুপুরের খাবার খেয়ে বাড়ি থেকে বের হচ্ছিলো। বাড়ির গলিতেই মেয়েটার সাথে তার দেখা। মেয়েটা রিমন এর মা কে খুজছে। মেয়েটা রিমন কে বললো তোমার আম্মুকে একটু ডেকে দাও তো। রিমন তার মাকে ডাক দিলো। মেয়েটা রিমন এর মায়ের সাথে কিছু কথা বললো। রিমন কিছু শুনতে পেলো না।

তারপর থেকেই রিমন মেয়েটাকে দেখলেই কথা বলে। মেয়েটাও খুব সহজভাবে রিমন এর সাথে কথা বলতেছে।রিমন এই বিষয়টা খুব ভালো করেই খেয়াল করে।

এভাবেই সপ্তাহ কেটে যায়। রাফার প্রতি রিমন এর নজরদারি আরো বেড়ে যায়। রিমন নিজে নিজেই নিজের ভিতর অনুভব করা শুরু করে। রাফার সাথে কথা বললেই তার ভালো লাগে। তার সাথে থাকতে মন চায়।সারাক্ষণ গল্প করলেও রিমন এর মন তৃপ্ত হয়না।

একদিন সকালে রিমন রাফার সাথে কথা বলতেছিলো। এটা তার মেঝো আপু দেখে রিমন কে খুব করে শাসালো। রিমন সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলো। রিমন ভাবতেছিলো, সে তো তেমন কোনো অন্যায় করেনি। কেন তার আপু তার সাথে এমন ভাবে কথা বললো।রিমন মনে মনে কষ্ট পেয়ে সিদ্ধান্ত নিলো সে আর রাফার সাথে কথা বলবে না। 

ঐদিন দুপুর বেলা রাফা রিমন কে ডাকতেছে কিন্তু রিমন কোনো কথা বলতেছে না। এটা দেখে রাফা রিমন এর কাছে এসে বললো, কি ব্যাপার! তুমি কথা বলতেছো না কেন?

সেদিন রিমন শুধু একটা কথাই বলেছিলো।তুমি এর পর থেকে আমার সাথে কোনো কথা বলবা না। রাফা সেদিন আর কিছু না বলে চলে গেলো।

ঐদিন বিকেল বেলা রিমন ফুটবল খেলতে গেছে। সন্ধায় বাসায় এসে রিমন রাফার কথা ভাবছে। ভাবতে ভাবতেই সে পাশের বাড়িতে গেলো রাফার সাথে দেখা করতে। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে জানতে পারলো আজ বিকেলেই রাফা তার বাসায় চলে গেছে। তার ভাই আসছিলো তাকে নিতে।

তারপর থেকে রিমন এর মন খারাপ। কোনো কিছুতেই ভালো লাগে না রিমনের।
পড়তে ইচ্ছা করে না, খেলতে ইচ্ছা করে না। সব সময় রাফার কথাই ভাবে।রাফার কথাই মনে পড়ে।সেদিন রিমন খুব আপসোস করেছিলো কেন সে রাফার সাথে এমন আচরণ করেছিলো।

তারপর আর কখনো সে রাফার খোজ পায়নি। সে আজও রাফার অপেক্ষায় আছে।প্রত্যেক বছরের ১৪ই ফেব্রুয়ারি রিমন রাফার জন্য ফুল নিয়ে বসে থাকে। রিমন বিশ্বাস করে রাফা ফিরে আসবে।

এভাবেই দিন চলতে চলতে আজ রিমন অনেক বড় হয়ে গেছে।সে এখন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়ে। এবার সে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ফাইনাল ইয়ারে আছে। সামনে ১৪ই ফেব্রুয়ারি।

তার ভার্সিটি লাইফের এটাই শেষ বছর। সে এবার ভাবছে, ১৪ই ফেব্রুয়ারি সে এবারো রাফার জন্য ফুল নিয়ে অপেক্ষা করবে। 

প্লিজ, রাফা তুমি ফিরে আসো। রিমন আজও তোমার অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকে।
লেখা: ১৩ই ফেব্রুয়ারি ২০১৯
রাত:০২:০৮ এএম

লিখেছেনঃ ওলিউল্লাহ, ৬ষ্ঠ ব্যাচ

No comments

কীর্তনখোলায় অদ্রি

অদ্রি, তুমি কীর্তনখোলার পাড়ে গিয়েছো কখনো? কখনো তার মনের লুকায়িত কথাগুলো শুনছো? জানো, তার না আমার মতো অনেক কষ্ট আছে। কিন্তু সে তার ক...

Theme images by konradlew. Powered by Blogger.