অপেক্ষার আর্তনাদ- মশিউর রহমান হৃদয়, ৬ষ্ঠ ব্যাচ


পকেটে থাকা মোবাইলটা বেশ কয়েকবার বেজে তা থেমে গেলো।
কিন্তু সেদিকে কোন খেয়ালই নেই নীলের।

ঘড়ির কাঁটা বিকেল তিনটা পেরিয়ে।
টিউশনিতে পৌঁছাতে আজও কিছুটা বিলম্ব।

ঘর্মাক্ত দেহ নিয়ে হেঁটে চলছে নীল।
ঘাম ঝরে পরে আর সে ছুটে চলে নিজ কর্মে।

মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেরা এই ঘামের বিনিময়ে স্বপ্ন পূরণ করে।

তাদের ঘাম ঝরে আর মনে স্বপ্ন গড়ে। নীল মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে।
মা শাহেলা বেগম,বাবা লুৎফর আর ছোট বোন অবন্তিকাকে নিয়ে ছোটখাটো একটা সংসার।

অনেক কষ্টে নীল আজ একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে।

পড়াশোনার পাশাপাশি কিছু টিউশনি করে নিজের খরচটা মেটায় সে।
নীলদের মত মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানগুলো অল্পতেই দায়িত্ববান হয়ে উঠতে শেখে।
বাস্তবতা তাই শেখায়।অল্পতে বড় হওয়া,পরিবারের দায়িত্বশীল ছেলে হয়ে সংসারের হাল ধরা।

ক্যাম্পাসের ছুটিতে বন্ধুরা ছুটে গেছে মায়ের স্নেহ ভালোবাসার শীতল আঁচলের নিচে।
কিন্তু নীল চাইলেও মায়ার টানে ছুটে যেতে পারছেনা।
আর কয়েকটা দিন টিউশনি করিয়ে বেতন পেয়ে যেতে হবে।

মায়ের জন্য একটা শাড়ি,
বাবার জন্য একটা পাঞ্জাবী,
বোনের জন্য একটা ডায়েরী নিয়ে যেতে হবে।

বোনের আবদার ছিল ডায়েরীটা।
বাবা-মায়ের কোন আবদার ছিলনা।
বাবা-মায়েদের কোন আবদারই থাকেনা।
কেবল ভালোবাসা আর দায়িত্বই থাকে।

স্বার্থের উপর ভর করে যখন পৃথিবী চলমান তখন চিরন্তন বিস্ময় তো এই যে বাবা-মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা মাখা দায়িত্ব।

ডায়েরীটা তো বোনের আবদার।
কিন্তু তার জন্য আলাদা করে কি নেওয়া যায়?
বই হলে মন্দ না।আর তার সাথে একটা হাতঘড়ি।
রঙ উঠে যাওয়া একটা শার্ট পড়নে কিন্তু চোখে মুখে রঙিন একটা ঢেউ খেলে যাচ্ছে।
সে আনন্দের ঢেউ কারো চোখে দৃশ্যমান নয়।

আগেরবার টিউশনির টাকা থেকে নিজের জন্য একটা শার্ট আর একজুড়ো জুতো কেনার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে সেমিস্টার ফি যোগাতে।
ফলস্রুতিতে বোতাম খসে যাওয়া শার্টটা পরিধান করেই দিন পাড় করতে হচ্ছে।
টিকে থাকার লড়াই পথে চলতে চলতে জুতোর তলাটা ক্ষয়ে যায়।
তবুও নীলদের টিকে থাকার লড়াইটার সমাপ্তি ঘটেনা।
বাবা-মা আর বোনের জন্য কেনাকাটা করার পর টাকা বেঁচে গেলে নিজের জন্য এইবার একটা শার্ট আর এক জুড়ো জুতো কেনা হবে ভাবছে নীল।

হঠাৎ একটা গাড়ি নীলকে খুব কাছ থেকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো।

আরেকটুর জন্য ধাক্কা লাগেনি।
শালারা যেন হাওয়ায় গা ভাসিয়ে গাড়ি চালায়।
মেজাজটাই খারাপ হয়ে থাকে নীলের

টিউশনি শেষে আজও বেতন না পেয়ে ছুটে চলে আবারো।
ক্যালেন্ডারের পাতায় ইংরেজী মাসের ৯ তারিখ হয়ে গেলেও বেতন দেওয়ার নাম গন্ধই নাই।

মাস পেরিয়ে মাসের শুরুতেই শ্রমের মূল্য দেওয়ার প্রথাটা বোধহয় এক শ্রেণীর অভিভাবক বেমালুম ভুলে যায়।
কিন্তু সন্তানকে একদিন না পড়ানো হলে এরা ঠিকই ক্যালেন্ডারে হিসেব কষে রাখতে পারে।

হয়তো এদের বোধদয়ই এমন যে টিউশনি হচ্ছে শখের পেশা।
শখের বশে টিউশনি নীলদের মানায় না তা কখনো সেইসব অভিভাবক শ্রেণীর বোধগম্য হবেনা।

এই বোধগম্যের অভাবটার জন্যই নীলদের ভুগতে হয়।
তবুও উচ্চস্বরযুক্ত অভিযোগ জন্ম নিতে পারলেও প্রকাশ পেতে পারেনা।

কতোজনই বা জানে এক একটা নীলদের টিউশনির পেছনে এক একটা গল্প থাকে!
কতোজনই বা জানতে পারে সে গল্প?

পড়ন্ত বিকেলে টিউশনি শেষে নীল হেঁটে চলছে।
মুখে তার হলদেটে রঙের রোদ পড়ছে।
বিকেলের এই রোদটা উপভোগ্য।
কিন্তু নীল তা পারছেনা।বাস্তবতা সব সময় সব কিছুই উপভোগ করতে দেয়না।

বিকেলের এই রোদের একটা মজার নাম আছে।
কনে দেখা রোদ।গ্রামে যখন কনে দেখানো হতো তখন নাকি এই রোদেই দেখানো হতো।তাই এই রোদের এই অদ্ভুত নাম।
ব্যাপারটা নীলের অজানা ছিল।রাত্রিই তাকে বলেছিল এই মজার নামের রোদের কথা।

কনে দেখা রোদের কথায় মনে পড়ে গেলো রাত্রির কথা।
কলেজ জীবন থেকে তাদের প্রেম। নীলের মনে পড়ে গেলো সেই বিকেলের কথা।
রাত্রি আর নীল হাতে হাত রেখে পাশাপাশি হাঁটছিল কাশবন ঘেষে।
হঠাৎ-ই কনে দেখা আলো ঠিকরে পরে নীলের মুখমন্ডলে।
একদৃষ্টিতে তাকিয়ে নীলকে দেখছিল রাত্রি।
নীলকে জিজ্ঞাসা করেছিল সেই নামকরণককৃত রোদের কথা।নীল তখনও জানতো না।পরে রাত্রি তাকে জানায় সেই রোদের নাম।

দেহের অস্তিত্ব মন থেকে মুছে গেলেও কখনো স্মৃতিমাখা মুহূর্ত মুছে যায়না মন থেকে।
মানুষকে অতীতে টানে কেবলই স্মৃতি।

আজকের দিনটায় যেন এলোমেলো নীলের মন।এলোমেলো মন থেকেই তো এলোমেলো মুহূর্তের জন্ম হয়।মনের শৃঙ্খলতা বেশিই প্রয়োজন।
তানাহলে সবকিছুতেই একটা বিশৃঙ্খলতার ছাপ পড়ে যায়।কোন কিছুই ঠিক থাকতে চায়না।

নীলের মনটা আজ বিশৃঙ্খল সীমান্তে বিরাজ করছে।
রুমে ফিরে বিছানায় বসে হাতে বোতলটা নিয়ে ঢক ঢক করে পানি পান করলো।
ক্লান্ত পরিশ্রান্ত অস্থিরতার মধ্য থাকা অবস্থায় দ্রুত গতিতে ঢক ঢক করেই পানি পান করে মানুষ।
তৃষ্ণা নিবারণ শেষে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে দেখল ফোন স্ক্রীনে 4 missed call লিখা।
বাসা থেকে ফোন দেওয়া হয়েছে।দুইবারের অধিক ফোনকলের মানে জরূরি ফোন।
জরুরী ভেবে ফোন দিলো নীল।
ফোনের ওপাশ থেকে আগত অবন্তিকার শব্দ।

বুদ্ধিদীপ্ত মেয়ে অবন্তিকা তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছে।
নীলের সবথেকে আদরের
প্রিয় মানুষ তার বোন অবন্তিকা।

অবন্তিকার আদরের শাসনে বন্দি নীল।
আর অবন্তিকার যতো আবদার সবই নীলের কাছে আদরের ছোট একটা বোন থাকা মানে শত কষ্টের মাঝেও একটা সুখের স্বর্গ থাকা।
আজ অনেকদিন হলো পরিবারের প্রিয় মুখগুলো দেখা হয়না।মন চায় ছুটে যেতে মায়ার টানে।
কিন্তু বাস্তবতার শক্ত শিকলে বন্দি নীলের আকাঙ্ক্ষা।

টিউশনির টাকাটা পেলেই শিকল মুক্ত হয়ে ছুটে যাওয়া যায় মায়ার টানে।
বোনের সাথে কথা বললে মন হালকা হয়ে যায়।

বোনের সাথে ফোনালাপ শেষ করে গা এলিয়ে শুয়ে আছে নীল।
কবে যাবে ছুটে বাড়ি সে অপেক্ষা নীলেরও।
চোখে মুখে আনন্দের রেখা চিহ্ন এঁকে শুয়ে থাকে নীল।

রাত গভীর হয়ে আসে।সেই সাথে সাথে স্বপ্নরেখাগুলোও গাঢ় হয়ে প্রস্ফুট হতে থাকে নীলের মনে।

ফোনের এলার্মে নীলের ঘুম ভাঙলো।
সময়ের কাঁটা ততক্ষণে ৭ টার ঘরে।
দ্রুততার সাথে প্রস্তুত হয়ে ছুটে গেলো বাস ধরতে।
যথাসময়ে নিজ সিটখানায় আসন নিয়ে বসে নীল।
মাসের দশম দিনে বেতন পেয়েই মায়ের জন্য শাড়ি,বাবার জন্য পাঞ্জাবী আর বোনের জন্য ডায়েরী,বই আর একটা হাতঘড়ি কেনা হয়েছে।

বাসস্ট্যান্ডে কত মানুষ নিজ গন্তব্যপানে ছুটছে।
সবাই তার নিজ গন্তব্যে ছুটে যাবে।

দীর্ঘ সময় পর বাসায় যাচ্ছে নীল।
বাস চলা শুরু করে।
আর নীলের অপেক্ষার অবসানের পালা এইবার।
স্বপ্ন চলে সময়ের সাথে সাথে।

জানালার পাশের সিটটায় নীল।
জানালার পাশে বসে বাইরের দিকটা ভালোকরেই উপভোগ করা যায়।

কিছুক্ষণ পরেই একজন ভদ্র লোক তার পাশের সিটটি দখল করে বসল।
মুখে জাঁদরেলি গোফ।
সুঠাম দেহের অধিকারী।

বাস চলছে আপন গন্তব্যে।
নীলের স্বপ্নগুলোও আপন গন্তব্যপানে অপেক্ষারত।।

বাস কখনো থামছে আর যাত্রী উঠছে-নামছে।
নীলের চোখে তন্দ্রা ভাবের আগমন।
সে চোখ বুঝে ঘুমিয়ে পড়ে।

ঘুম ভাঙার পরে পাশের সিটের সেই জাদরেলী গোঁফের লোকটির বদলে একজন অল্প বয়স্ক তরুণকে দেখতে পেলো।
তার মানে নিশ্চয় সেই লোকটি তার গন্তব্যে নেমে গেছে।

বড্ড অদ্ভুত বিষয়!
চলার পথে কত মানুষ উঠবে আর নামবে!
কত মানুষের সাথে দেখা হবে কথা হবে আবার চলে যাবে নিজ গন্তব্যপানে।
কিন্তু সবাই একত্রিত হয়ে শুরু থেকে শেষ করতে পারবেনা যাত্রা।

জীবন বড় অদ্ভুত।
জীবনের অদ্ভুত নিয়মগুলোর জন্যই জীবন বৈচিত্র‍্যময়।

পাশের সীটের যুবকটি ফোনে কারো সাথে কথা বলছে।
কথা শুনে বুঝা যাচ্ছে তার প্রেমিকার সাথে কথোপকথন।
তার প্রেমিকার সাথে দেখা করতে যাচ্ছে যুবকটি।

নীলও তো তার প্রিয়তমা রাত্রির সাথে দেখা করবে।
অভিমানী কন্যা রাত্রি বেশ অভিমান করতে পারে।
ছোট একটা ভুল বুঝাবুঝিতে দুজন দূরত্বে।

বাসায় যাওয়ার পর বলে কয়ে একবার দেখা করার জন্য রাজী করাবে রাত্রিকে।
নীলকে দেখার পর নিশ্চয়ই রাত্রির সব অভিমান আর ভুল বুঝা দূরে ঠেলে দূরত্বের অবসান ঘটবে।
কলেজ লাইফে রাত্রির সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে।

সম্পর্কের মাঝে একটু অভিমান,একটু রাগ একটু ভুল বুঝাবুঝির পর তার অবসান,একটু শ্রদ্ধা, একটু আবেগ,
একটু বাস্তবতাবাদী না হলে সম্পর্কের পূর্ণতা থাকেনা।ঠিক যেমন মসলাবিহীন তরকারি।

কিন্তু অতিরিক্ত হলে ব্যাপারটা অতিরিক্ত লবণযুক্ত তরকারির ন্যায় হয়ে যায়।

রাত্রি আলোকবর্তিকা হয়ে এসেছিল নীলের জীবনে।
প্রেমের আগমন আলোর আগমনের ন্যায়।

মোমবাতির আলোও অন্ধকারে আলো দেয় আবার সূর্যের আলোও অন্ধকার আলোকিত করে।
মোমবাতির আলোও কখনো নিভু নিভু করে জ্বলে আবার তা হঠাৎ-ই নিভে যায়।
সবশেষে তার সমাপ্তি অন্ধকারেই হয়।
কিন্তু সূর্যের আলোর পরিবর্তন কেবল সময়ের আবর্তনে।

কিছু প্রেম সূর্যের আলোর মতো হয়ে আসে। আবার কিছু প্রেম মোমের আলোর ন্যায়।

পৃথিবীর বুকে আজন্ম টিকে থাকতে পারেনা সেই নিভু নিভু প্রেম।

পাশের সিটে বসা প্রেমিক পুরুষের ক্ষণিকের ফিসফিস আলাপন শেষে তাদের কথায়
নীলের ভাবনায় ছেদ পড়ে।

দীর্ঘ ফিসফিস আলাপন দুষিত প্রেমের ভাষা।

ফিসফিস আলাপন শেষে কথা যখন স্পষ্ট হয়ে আসে তখন নীলের কাছে তাদের ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে আসে।

পরিবার অন্যত্র বিয়ে ঠিক করেছে বালিকার।
বালক বালিকার নিকট ছুটে যাচ্ছে পালিয়ে বিয়ে করবে বলে।

নীল সচরাচর বাসে বসে কারো সাথে কথা বলেনা।
কিন্তু এই বালকের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করলো।
ইচ্ছেটাকে সমর্থন দিতে চেয়েও আর দিলোনা।

কিছুক্ষণের মাঝেই বালকটি নেমে পড়ল তার গন্তব্যে।
এই সুযোগে বাসে বেশ কিছু হকারের আগমন।
তাদের প্রায় সবাই বিভিন্ন খাবার বিক্রি করছে।
মানুষকে পন্য কেনায় প্রলুব্ধ করে জীবিকা নির্বাহ তাদের।

জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছে নীল।
এক সুন্দরী কন্যার আগমন এবং তার পাশের সিট দখল করে বসল।

একজন মেয়ের সাথে বসে যাত্রার একটা অংশ ব্যয় করতে হবে নীলকে।
-আপনার নাম কি?কি করেন?যাচ্ছেন কোথায়?
- এতো প্রশ্ন একসাথে জুড়ে দিলে উত্তর দেওয়াটা তো কিছুটা মুশকিল হয়ে যায়।
- বার বার প্রশ্ন করতে গেলে আপনি যদি বিরক্ত হয়ে যান তাই!
নীল মুচকি হেসে উত্তর দিলো।

মেয়েটি নিজ থেকেই নীলের পরিচয় জানতে চাইলো।
নীলও মেয়েটির পরিচয় জানতে আগ্রহী বোধ করলো।
নীল মেয়েটিকে কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল এমন সময় কেউ একজন বলে উঠল,এই যে ভাই মাথা সোজা রেখে ঘুমান।
নীল চোখ খুলে দেখল পাশের সিটে পান চিবুতে চিবুতে মাথা ঝুলাচ্ছেন এক মধ্যবয়স্ক লোক।

নীল বুঝতে পারলো আরেক দফায় ঘুম হয়েছে তার।
আর এই ফাঁকেই সেই মেয়েটি এসে তার নাম-পরিচয় জেনে চলে গেছে।

নীল নড়ে চড়ে বসলো।
আবারো চোখে মুখে ভেসে উঠছে,কতোদিন পর আবার মা-বাবা আর ছোট বোনটার মুখ দেখতে
যাচ্ছে!
কষ্টের পর কিছু সুখ আসে যেই সুখের কাছে সব কষ্টই হার মানে।

হঠাৎ এক বিকট শব্দ সেই সাথে বেশ বড় মাত্রার এক ঝাঁকুনি খাওয়ার মধ্য দিয়ে সকল ভাবনার অবসান ঘটে যায় নীলের।

মুহূর্তের মাঝেই একটা গোলমেলে পরিবেশ সৃষ্টি হয় চারপাশে।

একটি ছোট বাচ্চা বসে কাঁদছে।
পাশেই মা আর বাবার মৃতদেহ।

বাচ্চাটির কান্না কেউ দেখছেনা।
আহতদের নিয়ে ছুটোছুটি করা হচ্ছে।
পুলিশ এসে মৃতদের নিয়ে গেছে।

কেউ কেউ যেন রক্তের সাগরে শুয়ে আছে।
মুহুর্তের মাঝে কি যে হয়ে গেলো!
নীলের মাথা,হাত পা থেকে রক্ত ঝরছে।
আর তাকিয়ে থাকতে পারলোনা।

পকেটে থাকা ফোনটি অনবরত বেজে চলেছে।
হয়তো প্রিয় আদরের ছোট বোন অবন্তিকার ফোন!
প্রায় অবচেতন অবস্থায় থাকা নীলও ফোনটা হাতে নিয়ে কথা বলতে পারলোনা।
আহতদের নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া হচ্ছে।
নীল যেন রক্তে মাখা লাল হয়ে গেছে তার দেহ।
তাকেও নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া হয়েছে।

নীল বাসায় আসে।
অনেকে আসছিল নীলকে দেখার জন্য।
নীলকে নিতে তারা বাবা গিয়েছিল হাসপাতালে।
তাদের দুজনকে একসাথে দেখে সেদিন মা শাহেলা বেগম খুব করে কেঁদেছিলেন।
অবন্তিকাও বাদ যায়নি।

এক শুক্রবার রাত্রিকে ছেলেপক্ষ দেখতে আসে।
ছেলে সরকারি চাকুরী করে,বিসিএস ক্যাডার।
রাত্রিকে দেখে ছেলেপক্ষ পছন্দ করে সেদিনই বিয়ে পড়িয়ে নিয়ে যায়।

ভুল বুঝে দূরে থাকার পরেও সেদিন রাত্রি মনে করেছিল নীলের কথা।
বাস্তবতা আজ রাত্রি-নীলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।।
একদিন দুজন স্বপ্ন দেখেছিল দুজনার বাসর হবে,দুজন একসাথে রাত জেগে তারার মেলা দেখবে,চাঁদের আলো গায়ে মাখাবে,নীলের কাঁধে কাঁধ রেখে পূর্ণিমা রাত জাগবে,নীলের হাত ধরে হাঁটবে।

সেদিন রাত্রির বাসর হয়েছিল।
তবে সেদিন ছিলোনা নীল।
হয়তো পরবর্তীতে রাত জেগেছে,কাঁধে মাথা রেখেছে,পাশাপাশি দুজন দুজনার হাতটি ধরে হেঁটেছে।

কিন্তু পাশে নীলের অস্তিত্ব ছিলোনা।
স্বামী সংসার নিয়ে বেশ ব্যস্ত রাত্রি।
সুখের সংসার।নীল নামক চ্যাপ্টারটা মুছে গেছে।
নারী জাতি সর্বদা বর্তমানকে প্রাধান্য দেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা রাখে।
সে ক্ষমতার কাছে পুরুষের ক্ষমতাও পিছিয়ে।

অবন্তিকা এখন বদলে গেছে।
গম্ভীর হয়ে থাকে সারাক্ষণ।
অবন্তিকার দিনযাপন তার কাকার পরিবারে।

বাবা লুৎফর ছুটে গিয়েছিল সেদিন হাসপাতালে ছেলেকে আনতে।
বাবা আর ছেলে একই বেশে ফিরেছিল সেদিন বাসায়।

হাসপাতাল থেকে আসার পর শাহেলা বেগম শেষ দেখেছিল ছেলে নীল আর নিজ স্বামীকে।
কিন্তু কোন কথা হয়নি।
কতদিন পর নীলকে দেখা হয়েছিল মায়ের!
নীল সেদিন কোন কথা বলেনি মায়ের সাথে।
ছেলের সাথে সাথে স্বামীও নিশ্চুপ হয়ে ছিল।

সেইদিনের পর থেকে শাহেলা বেগম হেমায়েতপুরেই থাকছেন।

রাত্রির অভিমান আর ভুল ভাংতে পারেনি নীল।
মায়ের জন্য কেনা শাড়ি,বাবার জন্য পাঞ্জাবী,বোনের জন্য ডায়েরী,হাতঘড়ি আর বই দেওয়া হয়নি নীলের।
পরিবার পরিজন কারো সাথে দেখা করতে পারেনি।

অপেক্ষার আর্তনাদে সব এলোমেলো হয়ে গেছে।

অবন্তিকা বেড়ে উঠবে,রাত্রি অতীত ভুলে গিয়ে স্বামী সংসার সন্তান নিয়ে পরে থাকবে।

নীলের স্বপ্নগুলো হয়তো নির্জনে একাকী কেঁদে উঠবে।


No comments

কীর্তনখোলায় অদ্রি

অদ্রি, তুমি কীর্তনখোলার পাড়ে গিয়েছো কখনো? কখনো তার মনের লুকায়িত কথাগুলো শুনছো? জানো, তার না আমার মতো অনেক কষ্ট আছে। কিন্তু সে তার ক...

Theme images by konradlew. Powered by Blogger.